প্রিয় পাঠক/পাঠিকাবৃন্দ,
অধ্যায় – ০১ পড়ে আমরা জানতে পেরেছি, পহেলা রমজানের তারাবী নামাজ পড়ে আসার সময়, সায়মন জানতে পারে তিনি সৃষ্টিকর্তার পক্ষ থেকে আসা তাঁর পিতা ও মাতার জন্য একটি উপহার স্বরূপ অতঃপর…
দ্বিতীয় অধ্যায় (সেহেরির প্রশ্ন)
বিবি সালমা তাঁর সন্তান (সায়মন) এর রুমে প্রবেশ করে যে দৃশ্য দেখলেন, তা সত্যিই তাঁকে বেশ অবাক করে তোলে। তিনি দেখেন সায়মনের রুমের বাতি জ্বালানো! যা মোটেও জ্বলার কথা নয়! আর সেই সাথে সায়মনও রুমে নেই! তাঁর বিছানা পুরোপুরি এলোমেলো হয়ে আছে।
এমন অদ্ভুত দৃশ্য দেখে বিবি সালমা বেশ চিন্তিত হয়ে যান! আর তিনি পুরো রুমে তাঁর সন্তান (সায়মন) কে খুঁজতে শুরু করেন। কিন্তু বিবি সালমা ব্যর্থ হন। তাঁর সন্তানকে তিনি কোথাও খুঁজে পান না!
অতঃপর তিনি তাঁর স্বামী (জাবেদ) কে ডাকার উদ্দেশ্যে রুম ত্যাগ করতে গেলে, হঠাৎ নিচ থেকে দুটি হাত তাঁর পা আকড়ে ধরে ফেলে। যার ফলে তাঁর পরবর্তী কদম ফেলা পুরোপুরি অসম্ভব হয়ে যায়। বিবি সালমা নিজ পায়ে এমন অদ্ভুত স্পর্শ পেয়ে বেশ অবাক হয়ে যান! আর সঙ্গে সঙ্গে তিনি পিছনে ফিরে তাঁকান! পিছনে ফিরে তাঁকিয়ে বিবি সালমা দেখেন- যেই দুটি হাত তাঁর পা আঁকড়ে ধরেছে, সেই দুটি হাত সোজা খাটের নিচ থেকে বেড়িয়ে এসেছে। বিবি সালমা হাতগুলোর দিকে ভালো করে লক্ষ্য করলেন, তখন তাঁর আর বুঝতে বাকি রইলো না যে এটি কার হাত! বিবি সালমা এইবার দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, এবং আলতো করে সেই হাতখানায় শুরশুরি দেওয়া শুরু করলেন। হাতে শুরশুরি অনুভব করে সেই হাতখানার মানুষটি ফিস ফিস করে হেসে উঠলেন এবং হাসি চেপে রাখতে গেলে তিনি খাটের সাথে ধাক্কা লেগে মাথায় হালকা আঘাত পান। এরপর তিনি মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে খাটের নিচে থেকে বেরিয়ে আসেন।
তিনি আর কেউ নয়, বরং বিবি সালমা ও জাবেদ সিকদারের একমাত্র সন্তান সায়মন সিকদার।
সায়মনের এমন হাস্যকর চেহারা দেখে বিবি সালমা হেসে উঠলেন। আর বললেন –
বিবি সালমা :- বেটা, তোমার চেষ্টা ভালো ছিলো। আশা করি পরের বার আরো ভালো করবে।
বিপরীতে সায়মন বলেন –
সায়মন :- ধন্যবাদ আম্মা। কিন্তু আমায় এটা বলুন? আপনি ভয় পান নি কেনো?
জবাবে বিবি সালমা বলেন –
বিবি সালমা :- বেটা, ভয় তো একমাত্র সৃষ্টিকর্তাকেই করা উচিত। এছাড়া অন্য কাউকেই নয়।
তিনি আরো বলেন –
বিবি সালমা :- বেটা, তুমি কি আমার একটি প্রশ্নের জবাব দিবে?
সায়মন – কি প্রশ্ন আম্মা?
বিবি সালমা প্রশ্ন করেন :- বেটা, তুমি কি রাতে ঘুমাও নি?
জবাবে সায়মন বলেন :- আম্মা, আমি রাতে ঘুমিয়েছিলাম। কিন্তু এলার্মের বিরক্তিকর শব্দে আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়।
সায়মনের এমন বক্তব্য শুনে বিবি সালমা ভাবনায় পড়ে যান! তিনি ভাবতে লাগলেন- সত্যিই তো, আমারও ঘুম ভেঙ্গেছে সেই এলার্মের শব্দে! কিন্তু আমি তো ঘড়িতে কোনো এলার্ম দেই নি! আর ওর বাবাও তো দেওয়ার কথা না, তবে ঘড়িতে এলার্ম দিলো কে?
এসব কথা ভাবতে ভাবতে বিবি সালমা কোথায় যেন হারিয়ে গেলেন! তাঁকে এমন ভাবনায় দেখে সায়মন বলেন-
সায়মন :- আম্মা, আপনি কি ভাবছেন?
জবাবে বিবি সালমা বলেন :- বেটা, আমি ভাবছি ঘড়িতে তো আমি এলার্ম দেই নি! তবে ঘড়িতে এলার্ম দিলো কে?
সায়মন তাঁর মায়ের মুখে এমন ভাবনার কথা শুনে মুচকি হেসে বললেন-
সায়মন :- আম্মা, ঘড়িতে আমি এলার্ম দিয়েছি।
বিবি সালমা ছেলের মুখে এমন কথা শুনে আবারো অবাক হয়ে যান এবং তাঁকে বলেন-
বিবি সালমা :- বেটা, ঘড়িতে তুমি এলার্ম দিয়েছো? কিন্তু কেন?
জবাবে সায়মন বলেন – আম্মা, আমি যখন বাবার সাথে নামাজ আদায় করে বাসায় আসি, তখন আমি লক্ষ্য করি আপনি খুবই ক্লান্ত। কিন্তু আপনাকে তো রোজা রাখার উদ্দেশ্যে সেহেরি খেতে হতো, তাই আমি রাতের খাবার শেষ করে আপনি রুমে প্রবেশের আগে ঘড়িতে এলার্ম দিয়ে রেখেছি। যাতে সেই এলার্মের শব্দে আপনার ঘুম ভেঙ্গে যায়।
সায়মন আরো বলেন –
সায়মন :- তাছাড়া আম্মা, আমার রোজা রাখার খুব ইচ্ছে! যদি আপনি সম্মতি দেন তবে আমি এবার আপনাদের সাথে রোজা রাখতে চাই।
ছেলের মুখে এমন মানবিক ও সু-ইচ্ছার কথা শুনে বিবি সালমা যেমন অবাক হন, তেমনভাবে তিনি গর্বিত অনুভব করেন। এবং সায়মনকে বলেন –
বিবি সালমা :- ধন্যবাদ বেটা, অসংখ্য ধন্যবাদ জানাই তোমায়।
সায়মন মায়ের কাছ থেকে ধন্যবাদ পেয়ে বড়ই আশ্চর্য হয়ে যান। এবং মাকে জিজ্ঞেস করেন-
সায়মন :- আম্মা, আপনি আমায় ধন্যবাদ কেনো দিলেন?
আমি কি এমন করেছি যার জন্য আপনি আমায় সম্মাননা প্রদান করলেন?
জবাবে তাঁর মা বলেন-
বিবি সালমা :- বেটা, তোমার চিন্তা ভাবনাগুলো সত্যিই বেশ সম্মানজনক। আমি খুবই ভাগ্যবতী একজন মা, যে তোমার মতো নেক ও উত্তম চিন্তাধারী সন্তান সৃষ্টিকর্তা আমায় দিয়েছেন।
তিনি আরো বলেন –
বিবি সালমা :- বেটা, তুমি আরো অনেক বড় হও। একজন পরিপূর্ণ মানুষ রূপে নিজেকে গড়ে তোলো এবং সবসময় নিজেকে সৃষ্টিকর্তার প্রেমে বিলীন করে রেখো, দেখবে তুমি অবশ্যই সৃষ্টির কাছে সম্মানজনক হয়ে উঠবে।
এই বলে বিবি সালমা তাঁর সন্তান (সায়মন) কে জড়িয়ে ধরে তার কপালে চুম্বন করেন। আর বলেন –
বিবি সালমা :- যাও বেটা, এখন হাত মুখ ধুয়ে খাবার টেবিলে গিয়ে বসো।
বিপরীতে সায়মন বলেন :- ঠিক আছে আম্মা। আমি যাচ্ছি, আপনিও আসুন।
এই বলে সায়মন চলে যান তাঁর মায়ের দেওয়া আদেশ পালন করতে। আর অন্যদিকে বিবি সালমা তাঁর স্বামী জাবেদ কে ডেকে তুলেন। এরপর তাঁরা সকলে একসাথে সেহেরির খাবার খেতে বসে পড়েন।
এভাবে হাসি-খুশির মধ্য দিয়ে সিকদার পরিবার সেহেরি উপভোগ করতে লাগলেন। হঠাৎই সেহেরি খাওয়ার মাঝে সায়মনের মনে একটি প্রশ্নের উদয় হয়! যেই প্রশ্নটি তাঁর খাবার হজম করতে বারবার বাধা দিচ্ছিলো! তাই সায়মন আর দেরি না করে তাঁর মাকে প্রশ্নটি করে ফেললেন। আর প্রশ্নটি হলো –
সায়মন :- আম্মা, আমায় একটি প্রশ্নের উত্তর দিবেন?
সায়মনের মুখে আবারো প্রশ্নের কথা শুনে বিবি সালমা ও জাবেদের খাবার গলায় আটকে যায়। এবং তাঁরা দুইজনেই কাশতে শুরু করেন। সায়মন তাঁর বাবা ও মায়ের এমন অবস্থা দেখে তাঁদের নিকট পানি এগিয়ে দেন। বিবি সালমা ও জাবেদ তাঁদের সামনে পানি পেয়ে তা পান করেন। পানি পান করা শেষ হলে বিবি সালমা বলেন –
বিবি সালমা :- হ্যাঁ বেটা, বলো! বলো তোমার কি প্রশ্ন?
জবাবে সায়মন :- আম্মা, আগে বলুন আপনারা কি আমার কোনো বিষয় নিয়ে বিরক্ত?
বিবি সালমা :- না বেটা, বিরক্ত কেনো হবো! তোমার যা জানতে ইচ্ছে করবে তা তুমি অবশ্যই বলবে।
সায়মন :- আচ্ছা ঠিক আছে।
মা ও ছেলের কথোপকথন শুনে জাবেদ মনে মনে বলেন-
জাবেদ :- হে খোদা, অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে। এ যাত্রায় আপনি আমাকে প্রশ্নের সম্মুখীন হতে বাঁচিয়েছেন।
অপরদিকে,
বিবি সালমা খুবই চিন্তিত হয়ে পড়েন। কে জানে কি প্রশ্ন করে বসে সায়মন! অতঃপর সায়মন তাঁর মাকে প্রশ্ন করেন-
সায়মন – আচ্ছা আম্মা, সৃষ্টিকর্তাকে ভয় পাওয়া উচিত নাকি মোহাব্বত করা উচিত? কোনটা আগে এবং অধিক প্রয়োজনীয়?
সায়মনের মুখে এমন প্রশ্ন শুনে তাঁর মা (বিবি সালমা) হতবাক হয়ে যান। এবং সেই মুহুর্তে তিনি ঠিক কি করবেন তাও বুঝতে পারছিলেন না ! কিন্তু ছেলের প্রশ্নের জবাব তো তাঁকে দিতেই হবে। তাই, বিবি সালমা মাথা ঘুরিয়ে তাঁর স্বামী (জাবেদ) এর দিকে দৃষ্টি ফেললেন। কিন্তু মজার বিষয় হলো, জাবেদ আগে থেকেই তাঁর (বিবি সালমা) মুখের দিকে চেয়ে আছে।
অবশেষে, বিবি সালমা কোনো কুল কিনারা না পেয়ে আমতা আমতা করে বললেন…
শীগ্রই আসবে… তৃতীয় ও শেষ অধ্যায় (সন্ধ্যার সায়মন)
বিঃদ্রঃ – “সন্ধ্যার সায়মন” গল্পের প্রথম অধ্যায় পড়তে নিচে ক্লিক করুন –
Leave a Reply